7th March, 2021
HOTLINE: 01618-881216
মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (প্রথম পর্ব)

  • প্রচ্ছদ
  • ফিচার
  • মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (প্রথম পর্ব)

শুধুমাত্র দ্বিজাতিতত্তের ভিত্তিতে   হাজার মাইল ব্যবধানে দুটো ভূখণ্ডকে একত্র করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি  হয়।  সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ বাংলাদেশের ( তদানীন্তন  পূর্ব পাকিস্তান) মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে।  শিক্ষা-দিক্ষা, চাকুরি-বাকুরী, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে এই বৈষম্যর পরিধি দিন দিন বাড়তেই থাকে। ফলে মাত্র ধর্মীয় ঐক্য ছাড়া

নৃতাত্ত্বিক, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পোষাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন ইত্যাদিতে বিস্তর ব্যবধান নিয়ে হাজার মাইল  ব্যবধানের দুটো ভূখণ্ডকে  বিমাতাসুলভ আচরণের মাধ্যমে অভিন্ন রাখার ক্ষেত্রে ফাটল দেখা দেয়। এমনি অবস্থায় পাকিস্তানের তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল  মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায়  উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দেন। ক্ষোভে গর্জে ওঠে বাংলার মানুষ। তখন সমগ্র পাকিস্তানে উর্দু ভাষাভাষী লোকের সংখ্যা ছিল ৭.২. ভাগ অন্যদিকে সংখ্যা ছিল বাংলা  ভাষাভাষী লোকের ৫৪.৬ ভাগ। ভূমিকম্পের মতই নিজেদের অস্তিত্বের শিকড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয় বাঙালি জাতি। ধীরে ধীরে উন্মেষ ঘটতে থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের।

ঐ বছরই ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সাহিত্য সম্মেলনে ডা. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, "আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা যা

প্রকৃতি  নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে-যা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুংগি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই'।

শুরু হয় ভাষা  আন্দোলন।  ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি  চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর। রফিক, বরকত, সালামদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। নব চেতনায় জেগে ওঠে বাংলাদেশ। গর্জে উঠে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া।

গর্জে উঠে বাজিতপুর। তৎকালীন দশম শ্রেণীর ছাত্র প্রয়াত কৃষকনেতা আনিসুর রহমানকে আহবায়ক করে গঠন করা হয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ॥ এই পরিষদের আহবানে ২২ ফেব্রুয়ারি বাজিতপুরে পর্ণাদিবস হরতাল পালিত হয়। ছাত্রদের সঙ্গে সর্বশ্রেণীর জনসাধারণ প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করে। মিছিলকারীরা থানা সদরে সরকারি অফিস. আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। টেলিগ্রাম অফিসের তার কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বাইরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা। সরারচর হাই স্কুল থেকেও প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। সেদিনের ঘটনার জন্য আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি  পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।

 

ভাষা আন্দোলনে উজ্জীবিত বাঙালি জাতির সামনে এগিয়ে আনে ৮ মার্চ ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন । তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা মৌলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক ও হোসেন  শহীদ সোহরাওয়াদীরি নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের  একুশ দফা কর্মসূচীর প্রতি সমগ্র বাংলাদেশে যে গণজাগরণের জোয়ার লেগেছিল বাজিতপুর অঞ্চলও এতে সমভাবে আন্দোলিত হয়েছিল। নির্বাচনের পূর্বে প্রতিদিন যুক্তফ্রন্ট নেতা হক-ভাসানীর নামেও নির্বাচনী প্রতীক নৌকা নিয়ে মিছিল বের হতো। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত থাকতো বাজিতপুরের রাজপথ।  শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নির্বাচনী প্রচারণায় বাজিতপুর এলে মুসলিম লীগের নির্দেশে ডাকবাংলার মাঠে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি কৈলাগ গ্রামের চাষকৃত জমির মাঠে মিটিং করেন। মিটিং এ বাধভাঙ্গা জনতার ঢল নামে। প্রত্যক্ষদশীদের অভিমত তারা এ ধরনের সমাবেশ বাজিতপুরে ইতোপূর্বে কখনো দেখেননি ।

 

৮ মার্চের নির্বাচনে বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে) ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৮টি আসন । মুসলিম লীগের দূর্গ বলে কথিত অত্র এলাকায় বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন যুক্তফ্রন্টের  প্রার্থী অষ্টগ্রামের সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (টেনা মিয়া)।

যদিও ৫৪ এর নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের  সরকারের ভাগ্যে খুব একটা স্থায়িত্ব লাভ ঘটেনি কিন্তু বাঙালি মানসিকতা বিকাশে এর প্রভার ছিল সুদূরপ্রসারী।

 

১১ জানুয়ারি ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান এক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ স্তরে  আশি হাজার মৌলিক বা বুনিয়াদী গণতন্রী (Basic Democrate) সংক্ষেপে  BD মেম্বার নির্বাচন করেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি এ BD  মেম্বারদের দ্বারা প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি পাচ বছরের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ম্যাডেন্ট নেন।

 

একই পদ্ধতিতে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলায় তখন জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা ছিল দুটি। ভৈরববাজার, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম, ইটনা (মিটামইন তখন ইটনা থানার অন্তর্ভূক্ত ছিল) ও নিকলী এই ছয় থানা মিলে একটি আসন এবং অপর ছয়টি থানা মিলে ছিল আরেকটি আসন । বাজিতপুর এলাকার আসনটিতে ভোটার সংখ্যা ছিল ৪০০ জন । অন্য কোন দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করায় আইয়ুব খানের কনভেনশন মুসলিম লীগ প্রার্থী আঃ মোনেম

খান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ঐ সনের ২৮ অক্টোবর আঃ মোনেম খানকে তদানীন্তন  পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করা হলে আসনটি শূন্য হয়ে যায়। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ঐ  আসনে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহনের মাধ্যমে বাজিতপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠ সৈয়দ সিরাজুল হুদা (তৌফিক মিয়া)। নির্বাচনের পূর্বে আইযুব-মোনেম বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জ্বালাময়ী বক্তব্যের মাধ্যমে প্রচুর জন সমর্থন আদায় করে নেন এবংনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্ত ভোটার যেহেতু শুধুমাত্র BD  মেম্বার  তাই নির্বাচনে

পরাজয় বরণ করেন। নির্বাচিত হন কনভেশন মুসলিম লীগের প্রার্থী নিকলীর আফতাব উদ্দিন কারার।

 

কৃতজ্ঞতাঃ মুহাম্মদ বাকের ( উনার রচিত মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর বইয়ের অবলম্বনে)