25th July, 2021
HOTLINE: 01618-881216
মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (শেষ পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (শেষ পর্ব)

  • প্রচ্ছদ
  • ফিচার
  • মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (শেষ পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (শেষ পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর - বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বাজিতপুর (শেষ পর্ব)

বাজিতপুর  ছাত্র সমাজের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ২২ জানুয়ারি সৈয়দ সিরাজুল হুদ এবং মনজুর আহমেদ ডাকবাংলার মাঠে শহীদ আসাদজ্জামানের গায়েবানা নামাজের ঘোষণা দেন।  ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের স্থানীয় নেতারা ডাকবাংলার মাঠে গায়েবানা নামাজ পড়তে নিষেধ দেয়। নিষেধ অমান্য করে যাতে গায়েবানা নামায না পড়তে না পারে সেজন্য ডাকবাংলা মাঠে মুসলিম লীগের গুন্ডা বাহিণীর সমাবেশ ঘটানো হয়। গায়েবানা নামাজের সংঘর্ষ এড়াতে তাতালচর আখড়ার মাঠে স্থান পরিবর্তন করা হয়। সময় নির্ধারণ করা হয় শুপুর ১২ টা। কৃষক নেতা মরহুম আনিসুর রহমান, সৈয়দ সিরাজুল হুদ এবং মনজুর আহমেদ একাত্ম হয়ে গায়েবানা নামাজ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সক্রিয় ভুমিকায় এগিয়ে আসেন।

নামাজের পূর্ব  রাতে সরারচর থেকে ছাত্রনেতা মুস্তাক আহাম্মদ ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রাহমান,

মনজুর আহমেদের বাসতবনে এসে নামাজের সমটা আরো এক ঘণ্টা পিছিয়ে নিতে অনুরোধ করেন। কারণ ও সময়ের মধ্যে ভৈরববাজারে উল্কা (তৎকালীন একটি মেইল ট্রেন) এসে যাবে।

উল্কা ট্রেনে ঢাকা থেকে অনেক ছাত্র আসবে । তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে উল্কা ভৈরবের ছাত্রগণ। পরে সকলে সরারচরে একত্রিত হয়ে বিশাল মিছিল নিয়ে জানাজায় অংশগ্রহন করবে। কিন্তু লোক সমাগম বেশী হওয়ায় পূর্ব নির্ধারিত সময় ১২টায় সৈয়দ  সিরাজুল হুদাঅ আনিসুর রাহমানের নেতৃতে তাতলচর আখড়ার মাঠে গায়েবানা নামায সম্পন্ন হয়। সরারচর থেকে বিশাল মিছিলটি ২টার দিকে বাজিতপুর ব্রিজে এসে পৌছে। মুসলিম লীগের পেটোয়া বাহিনীর প্রধান  মুসা  গুন্ডাবাহিনী নিয়ে  মিছিলকারীদের বাধা দেয়।

উত্তেজিত ছাত্ররা মুসা গুন্দাকে ব্রিজের নীচে খালের কাদাপানিতে ফেলে দেয়। মিছিলটি সরাসরি চলে যায় সাজু আহমেদ-এর বাড়ির সামনে। যেহেতু গায়েবানা জানাজা হয়ে গেছে তাই মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে  এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করতে থাকে॥ কেউ কেউ গাছের নিছে বসে  বিশ্রাম নিতে থাকে। এমনি অবস্থায় হঠাৎ করে মুসলিম লীগের একদল গুন্ডা ইট-পাটকেল, লাঠি-সোটা নিয়ে মনজুর আহমেদের বাড়ী আক্রমণ করে ব্যাপক ভাঙচুর করতে থাকে ৷ কেউ কেউ মনজুর আহমেদের বাংলা ঘরে আড্ডা দিচ্ছিল। গুন্ডা বাহিনীর ব্যাপক ভাংচুর ঠেকাতে  মনজুর আহমেদ বন্দুক নিয়ে গুন্ডা বাহিনীকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন গুলিবর্ষণ করেন। মনজুর আহমেদের বুদ্ধিমতী সহধর্মিণী এই সময় বন্দুক যদি উপরের দিকে তুলে না ধরতেন, তাহলে নির্ঘাত বেশ কয়েক জনের মৃত্যু ঘটতো। গুলির শব্দে আক্রণকারী গুণ্ডারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

 

মনজুর  আহমেদের বাড়ী আক্রমণ করে ব্যাপক ভাঙচুর করলেও। এই আক্রমণ মুসলিম লীগের জন্য অশনি সংকেত হিসাবে আবির্ভূত হয় এই সংবাদ পেয়ে সৈয়দ সিরাজুল হুদা সরাসরি কুলিয়ারচর রেলস্টেশনে গিয়ে ট্রেনে চেপে কিশোরগঞ্জ চলে যান। সেখানে তিনি SDO ও SDPO এর অফিস উত্তপ্ত করে তুলেন। যাওয়ার পথে প্রতিটি রেলস্টেশনে তিনি ট্রেনের দরজায় দড়িয়ে জ্বালাময়ী ভাষায় মনজুর আহমেদের বাড়ীতে ন্যাক্কারজনক আক্রমণ জনসাধারণের সামনে তুলে ধরেন । এদিকে পরদিন সকাল থেকে সরারচরের ছাত্র সমাজ ব্যারিকেড সৃষ্টিকরে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সরারচর অঞ্চলে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দেয়।

ঘটনার পর দিন থেকে শুরু হয়, প্রতিবাদ মিছিল | ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাজিতপুর ডাকবাংলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা। এই সভায় সেদিন জনতার ঢল নেমেছিল, শ্লোগানে- শ্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলেছিল বাজিতপুরের আকাশ-বাতাস। সেদিনই বাজিতপুরে কথিত মুসলিম লীগের দুর্গের ভিত কেপে ওঠে। বেজে উঠে পতনের ঘণ্টা।

 

৬৯ এর জানুয়ারি মাসে সূচিত গণঅভ্যুথান মার্চ মাসে এসে রুদ্ররুপ ধারণ করে। ১৫ মার্চ কথিত লৌহমানব আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে সরে যেতে বাধ্য হন। ২২ মার্চ মোনেম খানকে অপসারণ করে এম এন হুদাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করা হয়। সমাপ্তি  ঘটে স্বৈরাচারী আইযুব-মোনেম পর্বের ।  শুরু হয় আরেক স্বৈরাচার ইয়াহিয়া কাহ্ন পর্ব।

বাজিতপুরে পহেলা অক্টোবর ’৬১ সৈয়দ সিরাজুল হুদা আনুষ্ঠানিক ভাবে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। ফলে আওয়ামীলীগের সাংগঠিক ভিত্তি আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

গণ-আন্দলনের মুখে ইয়াহিয়া খান, আইয়ুব খানের  তথাকথিত মোলিক গণতন্ত্র বাতিল করে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার ভিত্তিতে ১৯৭০ খিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষনা করা হয়। নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্থানে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামি লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ভৈরববাজার, কুলিয়ারচর, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুর থানা সমন্বয়ে গঠিত আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জনাব জিল্লুর রহমান প্রচুর ভোটের ব্যবধানে জয়লাত করেন। উল্লেখ্য যে, বাজিতপুরের এককালের বলিষ্ঠ প্রতিবাদী নেতা সৈয়দ সিরাজুল হুদা ১৯৭০

খিস্টাব্দের ১১ মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পিডিপি-র প্রার্থী হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। বলতে গেলে তার পিডিপি-তে যোগদানকেএকটি নক্ষত্রের পতন বলে আখ্যায়িত করা যায়। হঠাৎ করে থেমে যায় তার বলিষ্ঠ কন্ঠ। পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি ছিলেন একেবারেই নীরব।

 

৭০ এর ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন। বাংলাদেশ তথা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ টি আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয়লাভ করে। বাজিতপুর, নিকলী থানা ও বর্তমান মিঠামইন থানার মিঠামইন, ঘাগড়া ও ঘোপদীঘি ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত ময়মনসিংহ ৩১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জনাব মনজুর আহমেদ জয়লাভ করেন।

জাতীয় পরিষদে ১৬০ ও সংরক্ষিত মহিলা আসনে ৭টিতে বিজয়ী হয়ে ১৬৭ টি আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের গৌরব অর্জন করে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সরকার গঠনের আহবানের জন্য অপেক্ষায় থাকে। ৮৮টি আসন পেয়ে পাকিস্তান পিপলস পার্টি দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। উল্লসিত বাঙালি- এত সংগ্রাম, এত রক্ত, এত ত্যাগ তিতিক্ষার পর তারা আজ সার্বিক অর্থে জয়ী। স্বপ্ন দেখতে থাকে তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করবেন, সব বৈষম্যের অবসান ঘটবে, বাঙালিরা পাবে তাদের ন্যায্য অধিকার।

কৃতজ্ঞতাঃ মুহাম্মদ বাকের ( উনার রচিত মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর বইয়ের অবলম্বনে)